গোলকধাম মন্দির : গ্রিক স্থাপত্য শিল্পের অনুসরণে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
ট্রাভেল ব্ংলাদেশ স্পেশাল : প্রাচীন উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর স্থাপিত অনন্য একটি মন্দির
ছবি : সংগৃহীত
পঞ্চগড়ের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে 'গোলকধাম মন্দির' অন্যতম। প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকাভুক্ত এই মন্দিরকে প্রথম নজরে ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলে মন্দিরের স্থাপত্য শিল্প নজর কাড়তে বাধ্য। পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলা থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরত্ব পেরোলেই দেখা মিলবে এই প্রাচীন মন্দিরের। মূল শহর থেকে ভেতরে শালডাঙ্গা গ্রামে এটি অবস্থিত। শ্রী গোলক কৃষ্ণ গোস্বামীর স্মরণে মন্দিরটি নির্মিত। ১৮৪৬ সালে এটি স্থাপিত হয়। সে হিসেবে, মন্দিরের বয়স এখন ১৭৪ বছর। পুরো মন্দিরটি মাটি থেকে বেশ উঁচুতে বৃত্তাকার ভিতের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতটি ৩ স্তরবিশিষ্ট। মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে রয়েছে সিঁড়ি। মন্দিরের সামনে দুটো তুলসী মঞ্চ রয়েছে।
মন্দিরের স্থাপত্যশিল্প নজর কাড়তে বাধ্য। ছবি : প্রোলিফিক মাস্টারমাইন্ড
মন্দিরটি দেখতে ছয় কোণাকার। ছয়টি কোণে মোট ছয়টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রবেশদ্বারগুলো খিলান আকৃতির। খিলানের উপরের অংশে রয়েছে ফুল,পাতা ও পাখির নকশা। গোলকধাম মন্দিরের নির্মাণশৈলীতে প্রাচীন গ্রীসের স্থাপত্যশিল্পের ছাপ পাওয়া যায়। মন্দিরের প্রতিটি দরজার বাম ও ডানদিকে দুটো করে করিন্থিয়ান কলাম আছে। এধরনের কলাম প্রাচীন গ্রীসের মন্দিরগুলোতে দেখা যেত। করিন্থিয়ান কলামগুলোর ওপরের অংশে ফুল ও মুখায়বের নকশা আছে। প্রতি দুই দরজার করিন্থিয়াম কলামের মাঝে রয়েছে একটি করে খাঁজ বিশিষ্ট কলাম। মন্দিরের উপরে একটি নামের ফলক আছে। নামের ফলকের দু-পাশে একটি করে হাতির মুখায়বের নকশা রয়েছে। ফলক থেকে মন্দিরের স্থাপিতকালও জানা যায়। মন্দিরের প্রধান তলার উপরে আরও দুটো তলার মত গঠন দেখা যায়। মন্দিরটি যেন ইট, পাথর ও কাঠের স্থাপনার মেলবন্ধন। পুরো মন্দিরের পরতে পরতে রয়েছে রুচিশীলতার ছাপ। মন্দিরের সবচেয়ে উপরের তলায় রয়েছে ৫টি চূড়া। মাঝের চূড়াটি সবচেয়ে বড়, বাকিগুলো ছোট। প্রতিটি চূড়ার নিচের অংশে রয়েছে ৪টি করে সরু দরজা। বলাই বাহুল্য, এই সরু দরজাগুলোতেও ফুল ও নানা নকশা রয়েছে।
মন্দিরের নামফলক। ছবি : জাগো নিউজ ২৪
দরজার উপরের দিকে গম্বুজ আকৃতির গঠনের উপরের রয়েছে কলসের মত ছোট গম্বুজ। কলস আকৃতির গম্বুজের গায়ে আকর্ষণীয় ফুল, লতাপাতার ভারী নকশা রয়েছে। প্রতিটি চূড়ার শীর্ষে রয়েছে একটি করে ত্রিশূল। আরও রয়েছে একটি নকশাদার গোলাকার পাত। এটি দেখতে অনেকটা সুদর্শন চক্রের মত। গোলাকার পাতের সাথে আড়াআড়িভাবে একটি দণ্ড সংযুক্ত। এটি শ্রী কৃষ্ণের বাঁশির প্রতীকী চিহ্ন বহন করে। সবচেয়ে বড় চূড়ার শীর্ষে 'গোলক ধাম' নামযুক্ত পাতলা ফলক রয়েছে। আঠারো শতকেও এমন নজরকাড়া স্থাপত্য নিদর্শন ছিল তা ভাবতেও অবাক লাগে। মন্দিরে অতীতের পোড়ামাটির নকশাগুলোর কোন অবশিষ্টও বেঁচে নেই। মন্দিরের ভেতরে কোন জাঁকজমকের ছাপ নেই। মন্দিরের ভেতরের ঘরটি চার কোণাকার। ঘরের ছাদ কাঠের বীম দিয়ে তৈরি।অতীতে এখানে রাধাকৃষ্ণের পূজা করা হত। বর্তমানে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্যোগে শ্রী কৃষ্ণের পূজা করা হয়।
ছয় কোণাকার গোলকধাম মন্দির। ছবি : ভ্রমণ গাইড
দীর্ঘ সময়জুড়ে এই মন্দির অবহেলায় পড়ে ছিল। পরবর্তীতে ২,০০০ সালে এই মন্দিরকে প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকায় যুক্ত করা হয়। এছাড়া একটি তুলসী মঞ্চে ভেঙ্গে গিয়েছিল। যা ইতোমধ্যেই সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া মন্দিরের মূল রাস্তার সামনে রয়েছে একটি কুয়া। সংস্কারের অভাবে এখন এটি ব্যবহারযোগ্য নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক এই মন্দিরকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে সংস্কার কাজ এখন একটি দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশেষে, মন্দিরটি তার জৌলুস হারিয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় ইট-রং-চুন খসে গেছে। কিন্তু এর মাঝেও স্থাপনা বৈশিষ্ট্য উঁকি দেয় সেই পুরনো রূপেই। আর তাই প্রত্নতত্ত্ব, শিল্প ভালোবাসে এমন মানুষের মন কাড়তে বাধ্য এই মন্দির। পঞ্চগড়ে গেলে ঘুরে আসতে পারেন এই প্রাচীন মন্দির থেকে। নিজের চোখে দেখে আসতে পারেন গ্রীক স্থাপত্যের প্রতিবিম্বের এক ঝলক।
তথ্যসূত্র : https://bn.m.wikipedia.org/wiki/গোলকধাম_মন্দির http://www.panchagarh.gov.bd/site/tourist_spot/1fabdd8e-18ff-11e7-9461-286ed488c766/গোলকধাম%20মন্দির https://en.m.wikipedia.org/wiki/Ancient_Greek_architecture https://bn.m.wikipedia.org/wiki/বাংলাদেশের_প্রত্নতাত্ত্বিক_স্থানের_তালিকা https://bn.eferrit.com/করিন্থীয়-কলাম-সম্পর্কে/ https://youtu.be/p1JKjGS81z4